
খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঝুঁকিতে থাকা ‘লাল’ শ্রেণি থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ। প্রায় তিন বছর ধরে বাংলাদেশ এই ঝুঁকিতে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের নানা উদ্যোগে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার বেড়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ‘লাল’ অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তার হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য গত নভেম্বর মাসের পর বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ১০ থেকে ১২ মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা–বিষয়ক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ ১০ মাস ধরেই বাংলাদেশ লাল তালিকায় আছে। এর মানে হলো, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কমছে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তা আরও বাড়তে পারে।
১০ মাস ধরে বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও ১৩টি দেশ লাল শ্রেণিতে আছে। দেশগুলো হলো ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন, জাম্বিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, মলদোভা ও রাশিয়া।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া বেশ উদ্বেগের বিষয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা দেশের আমদানির ওপর প্রভাব ফেলবে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। সেলিম রায়হান আরও বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে বেশ ব্যর্থ হয়েছি। সরকারি সংস্থার হিসাবেই সাড়ে ৮–৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, যা এমনিতেই অনেক বেশি। বাস্তবে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি।
কত হলে কোন শ্রেণিতে
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কোন দেশে কত বেশি, তা বোঝাতে বিভিন্ন দেশকে চার শ্রেণিতে ভাগ করেছে বিশ্বব্যাংক। যেসব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশ বা তার বেশি, সেসব দেশকে ‘বেগুনি’ শ্রেণিতে; যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, সেসব দেশকে এই শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
এরপর ৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে যেসব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি, তাদের ‘লাল’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও মোটামুটি ঝুঁকিতে আছে।
এ ছাড়া ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে ‘হলুদ’ ও ২ শতাংশের কম মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে ‘সবুজ’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৭২টি দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে সংস্থাটির প্রতিবেদনে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি আরও খারাপ
বিশ্বব্যাংক গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত হিসাব দিলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হিসাব দিয়েছে।
বিবিএসের হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি।
এর আগে গত বছরের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ ছিল। এরপর খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে। একপর্যায়ে সাত অঙ্কের ঘরে নামে। পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশ বেশি। এতে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ এত দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তিতে পড়েননি আগে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হওয়ার মানে হলো, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আপনার খাবার কিনতে যদি ১০০ টাকা খরচ হয়। পরের এক বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খাবার কিনতে লাগল ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা। প্রতি ১০০ টাকায় খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ৩০ পয়সা। এর মানে, বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষের খাবার খরচ প্রায় এক-দশমাংশ বেড়েছে।
এটি ধনী–গরিবনির্বিশেষ গড় হিসাব। গরিব মানুষের আয়ের বড় অংশ খাবারে খরচ করতে হয়। অনেকের আয়ের দুই–তৃতীয়াংশই খাবার কিনতে চলে।
মূল্যস্ফীতি একধরনের করের মতো। ধরুন, আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। যদি আয় না বাড়ে, কিন্তু খাবারের দাম বেড়ে গেল, তাহলে আপনাকে ধারদেনা করে চলতে হবে নতুবা খাবারের তালিকা ছোট করতে হবে।
অন্য শ্রেণিতে কোন দেশ
উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকের তালিকায় সবচেয়ে খারাপ শ্রেণি বেগুনি। গত এক বছরের মধ্যে টানা ৯ মাস বেগুন শ্রেণিতে আছে মালাউয়ি। আট মাস ধরে ইরান ও জাম্বিয়া। আর সাত মাস বেগুনি শ্রেণিতে আছে তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা।
তালিকায় থাকা বাকি দেশগুলো গত এক বছরে কখনো লাল, কখনো বেগুনি, কখনোবা হলুদ বা সবুজ তালিকায় রয়েছে। কেউ নিজেদের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির উন্নতি করেছে, কারও অবনতি হয়েছে।
Comments