চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে উদ্বেগ / সাইবার আইনের অপব্যবহার আগের সরকারের দমন–পীড়নেরই পুনরাবৃত্তি: এইচআরডব্লিউ
নতুন সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশে অন্তত চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে আগের সরকারের দমনমূলক চর্চার একটি উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা বলে মন্তব্য করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। ২৩ এপ্রিল নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটি এমন মন্তব্য করে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকারের উচিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা, ভিন্ন মত দমনে বিদ্যমান আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা এবং যেসব আইন অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে, সেগুলো সংশোধন বা বাতিল করা।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিপুল জয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর দেড় বছর আগে একটি গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। শেখ হাসিনার সরকার সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কণ্ঠরোধ করতে কঠোর আইন ব্যবহার করত। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী আইনগুলো সংশোধনের ক্ষেত্রে বেশি দূর এগোতে পারেনি।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া–বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার দাবিতে বাংলাদেশিরা জীবন বাজি রেখেছিল। এখন নতুন সরকারের সেই সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি সরকার অপছন্দনীয় কনটেন্ট পোস্ট করার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের গ্রেপ্তার করছে।
কার্টুন শেয়ার করায় গ্রেপ্তার
সবশেষ ১৭ এপ্রিল এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি একটি কার্টুন পোস্ট করেছিলেন যেখানে সরকারের এক আইনপ্রণেতাকে চিত্রিত করা হয়েছিল এবং সংসদে তাঁর করা একটি রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যের উদ্ধৃতি দেওয়া ছিল। ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার নিজ বাসা থেকে নাসিমকে আটক করা হয়।
এর আগে ক্ষমতাসীন দলের এক কর্মী পুলিশের কাছে নাসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। পরে অনলাইন ব্ল্যাকমেলের অভিযোগে ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর একটি ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ মামলার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘একটি পাবলিক ফোরামে করা রসিকতা, যা সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছে এবং সেই রসিকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি কার্টুন কীভাবে “ব্ল্যাকমেল” হতে পারে?’ ২১ এপ্রিল নাসিম জামিন পেয়েছেন।
৫ এপ্রিল দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক সওদা সুমিকে (বিবি সওদা বেগম) ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, তিনি ফেসবুকে ‘সরকারবিরোধী’ মন্তব্য পোস্ট করেছিলেন। এই বিধানে কর্তৃপক্ষকে ‘আমলযোগ্য অপরাধের’ ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য’ পাওয়ার ভিত্তিতে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অতীতে এটি খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। দুই দিন পর আদালত তাঁকে জামিন দেন।
গত ৩১ মার্চ উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় জামায়াতের আরেক সমর্থক আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর ফেসবুক পেজে প্রধানমন্ত্রীর একটি বিতর্কিত ছবি শেয়ার করেছেন, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা এমন অভিযোগ করলে পুলিশ তাঁকে ৫৪ ধারায় আটক করে। পরে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ’ ও ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ প্রয়োগ করে। পুলিশ বলেছে, ‘আমরা তাঁকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করতে পারি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছিলেন।’ ১ এপ্রিল একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁর আটকের আদেশ বহাল রাখেন।
২ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে ‘অপমান করা’র অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠন যুবদলের নেতা-কর্মীরা শাওন মাহমুদকে তুলে নিয়ে পুলিশে দেন। পরে তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তারা তাঁর এমন একাধিক পোস্ট তদন্ত করছে, যা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হতে পারে।
‘আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে’
বেশ কয়েক বছর ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিপীড়ন চলার পর অন্তর্বর্তী সরকার ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারির মাধ্যমে আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও আনা হয়েছে, যেমন অনলাইন কনটেন্টে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর প্রতিনিধিই শুধু অভিযোগ করতে পারবেন, এমন বিধান রাখা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ক্ষেত্রে এ বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, নতুন বিএনপি সরকারের অধীনে একটি উদ্বেগজনক নজির তৈরি হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের নির্দেশে পুলিশ সুরক্ষা দেওয়া বাক্স্বাধীনতাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার চেষ্টা করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশে এখনো এমন অনেক বিধান রয়েছে যা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং তদন্তের ক্ষমতা ও অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে দুর্বল বিচারিক তদারকি।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাতিল করে মানবাধিকারসম্মত আইন প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে তারেক রহমান সরকারের উচিত, অতি প্রয়োজনীয় পুলিশি সংস্কারে উদ্যোগী হওয়া এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা, যাতে কর্মকর্তারা বর্তমান সরকারের অনুগত না থাকেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশ এই চুক্তির অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি তাদের ‘জেনারেল কমেন্ট নম্বর ৩৪’-এর মাধ্যমে স্পষ্ট করেছে, ১৯ অনুচ্ছেদ অনলাইন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং বিধিনিষেধগুলো অবশ্যই সুনির্দিষ্ট, সহজবোধ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে। অস্পষ্ট বা ঢালাওভাবে লেখা শব্দাবলি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যথার্থতা ও প্রয়োজনীয়তার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় কর্তৃপক্ষের দ্বারা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, এসব গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে নিরাপত্তা খাতের অনিয়মগুলো গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে এবং পুলিশ কেবল নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য পরিবর্তন করেছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর সমর্থক ও পুলিশের কাছে একটি কঠোর বার্তা পাঠাতে হবে যে প্রত্যেকের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় তাঁকে অবিলম্বে প্রতিষ্ঠান ও আইন সংস্কার করতে হবে।