শুক্রবার, ২১ জুন, ২০২৪
Friday, 21 June, 2024
বঙ্গবন্ধুর দুঃখীকন্যা শেখ রেহানা

শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা দক্ষতা পাশে বসে কয়েকগুণ বাড়িয়েছেন শেখ রেহানা

সুব্রত মণ্ডল
  13 Sep 2023, 12:22
সুব্রত মণ্ডল.........ছবি: সংগৃহীত

পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টে আধুনিক সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপবিারে শিশুপুত্র রাসেল, অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূসহ খুনি মোশতাক জিয়াউর রহমানের কুট কৌশলে বিপদগ্রহস্থ কিছু সেনা সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। ব্রাসেলসে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই তনয়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। প্রবাস বসে বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পান। সেই সাথে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলার মানুষের জীবনে যে ভয়ানক দিন অপেক্ষা করছে তা বুঝতে পারেন। অমানবিক ও অমানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেও পঁচাত্তর পরবর্তী মৃত্যু উপত্যকা বাংলাদেশে স্বৈরশাসক জিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন। তাঁরা স্বপ্ন দেখতেন সকল প্রতিকূলতা দূর করে, রক্তের সমুদ্র জয় করে একদিন ঠিকই তারা অগ্রসর হবেন বাংলাদেশে। দিন যায়, রাত যায়, পিতৃহারা, স্বজন হারা শেখ হাসিনা শেখ রেহানা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে সময় পার করতেন। আর পরম করুণাময়ের দোয়ারে বারংবার প্রার্থনা করেন বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য, অত্যাচারী স্বৈরশাসকদের হাত থেকে বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষার জন্য। নেতাকর্মীসহ কোটি কোটি বাংলাদেশীদের আবেগকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু খুনিদের রক্তচক্ষু, মৃত্যুর হুমকিকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। নেতাকর্মীদের প্রবল সমর্থনও ভালবাসায় সেনাপতি হিসেবে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশকে জন্মদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন। আওয়ামী লীগ সেনাপতি শেখ হাসিনার পাশে বসে পর্দার অন্তরালে গিয়ে সব সময় পরামর্শ দিতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ তনয়া শেখ রেহানা। যেমন করে বঙ্গবন্ধু পরামর্শ দিতেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব।

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। শেখ হাসিনার পাশে বসে শেখ রেহানা তাঁর এই দক্ষতাকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ছোট খাট বিষয় কখনো চোখ এড়াতে পারে না। তবুও আড়াল থেকে শেখ রেহানা বড় বোন শেখ হাসিনাকে ধীর স্থিরভাবে বিভিন্ন বিষয় মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার নীরব সেনাপতির ভূমিকা পালন করে চলেছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে কখনোই তা শেখ রেহানাকে স্পর্শ করেনি। কেনইবা করবে তিনি তো একই মহান নেতা শান্তিকামী বিশ্বের অগ্রদূত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার মতোই যোগ্য উত্তসূরী। অথচ বাংলাদেশে বন্দুকের নলের জোড়ে পাকিস্তান থেকে উড়ে এসে ক্ষমতায় বসে দেশকে ভোগ বিলাসের বস্তুতে পরিণত করেছে জিয়াউর রহমান নামের একজন। পাকিস্তানের সাবেক গোয়েন্দা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা  জিয়াউর রহমান খন্দকার মোশতাককে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করে ক্ষমতায় আসেন। সেই একই ধারা জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান ও কোকো রহমানের রক্তে বইছে। জিয়াউর রহমান উত্তোর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবার পর পর তারেক জিয়া সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্পে তারেক জিয়া প্রত্যক্ষভাবে কমিশন বাণিজ্যসহ খাম্বা ব্যবসায় নেমে বাংলা আপামর জনসাধারণকে শোষণ করতে উঠে পরে নামে। সময়ের তাগিদে ধীর স্থির বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যার শেখ রেহানা সম্পর্কেও জাতি জানতে চায়। তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার মত শেখ রেহানা সম্পর্কে বেশ কৌতূহল। তরুণ প্রজন্মের জন্য আমার ক্ষুদ্র প্রয়াসে দেখাতে চাই আধুনিক মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণে শেখ রেহানার অবদান।

১৯৭৫  সালের ১৫ আগস্টে পরম ঈশ্বর নিজ হাতে খুনি খন্দকার মোশতাক জিয়াদের হাত থেকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে রক্ষা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বিশ্বাস তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। আমরা যদি সবার উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতাম তাহলে ১৫ আগস্টের পর তো দুই বোন ঘরেই বসে থাকতাম। কার ভিতর কি আছে বলা মুশকিল হলেও সবার উপর থেকে তো বিশ্বাস তো হারানো যায় না। যে রাজনীতি ছোট্ট বয়সে নিজেদের কাছ থেকে বাবাকে সবসময় বিচ্ছিন্ন রাখত, সেই রাজনীতি যখন পুরো পরিবারকে ছিনিয়ে নিল, এমন মনোভাব নিজের ভিতরে কাজ করলেও একসময় এসে মনে প্রশ্ন জেগেছে, পুরো পরিবার নিয়ে গেলেও আল্লাহ কেন তাদের দুই বোনকে বাঁচিয়ে রাখলেন। নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কোন উদ্দেশ্য আছে? মনে হলো- এই খুনিদের ধরার জন্যই হয়তো আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন।’

কাকতালীয়ভাবে আধুনিক বাংলার নির্মাতা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে পরম ঈশ্বর যেন শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশীদের জন্য এই সেপ্টেম্বরে উপহার হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার ঘরে পাঠিয়েছেন। তাই মার্চের মত বাংলাদেশে ‘সেপ্টেম্বর’ মাসও গুরুত্বপূর্ণ। এই সেপ্টেম্বরেই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার শুভ জন্মদিন। ১৯৪৭  সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা ও ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শেখ রেহানা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এর কোলে জন্মগ্রহণ করেছেন। মায়ের ডাক নাম রেণুর প্রথম অক্ষর আর বড়বোন হাসিনার শেষের অক্ষর অক্ষুণ্ণ রেখে নাম। পারিবারিক পদবী যুক্ত হয়ে পরিপূর্ণ নাম শেখ রেহানা। অতি আদরের ছোট ভাই রাসেলের কাছে যিনি ছিলেন ‘দেনা’ আপা। রাসেলের দেনা আপা ডাকলেও  অন্যদের কাছে শেখ রেহানা ছিল ‘মুন্না’ নামে। লন্ডনে ১৯৭৭ সালে অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক সঙ্গে শেখ রেহানা 'র বিয়ে হয়। অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও শেখ রেহানা দম্পতির তিন ছেলেমেয়ে। শেখ রেহানা একজন রত্নগর্ভা মা। বড়ো মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেনের লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রী ও তিন-বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। একমাত্র ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। আওয়ামী লীগের গবেষণা কাউন্সিল সিআরআইয়ের সাথে যুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ছোট মেয়ে কন্ট্রোল রিস্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল রিস্ক এনালাইসিস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন।

একটি অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত আনিসুর রহমানের নিবন্ধে ‌‌‘আন্তর্জাতিক পরিসরে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড: বিচারের প্রথম ডাকটি ছিল শেখ রেহানার’ থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরি।

‘ভারতের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বসবাসরত শেখ রেহানার পড়ার কথা ছিল শান্তিনিকেতনে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সেসময়ের সরকার জানালো তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না। উপায় না দেখে শেখ রেহানা পাড়ি জমালেন লন্ডনে, সাহায্য করলেন তার ফুফা সেনা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান (পরে সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন)।  তবে টিকেটের ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না। শেখ রেহানা তার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এটি জানতে পেরে ইন্দিরা গান্ধী তার টিকেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শেখ রেহানা দিল্লি থেকে বিলেত গেলেন। সেখানে গিয়ে মুখোমুখি হলেন আরেক নিষ্ঠুর পৃথিবীর। চেনা লোকজনও মুখ ঘুরিয়ে নিত। চাকরি খুঁজছিলেন হন্যে হয়ে। কিন্তু প্রথম প্রথম কেউই এগিয়ে আসছিল না। তারপর কাজ পেলেন লাইব্রেরি ও বুক পাবলিশিং হাউজে। কঠোর পরিশ্রম করতে শুরু করলেন। অসহায়ত্ব থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়ে করবেন।’

১৯৭৪ সালেই পারিবারিকভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেখ রেহানাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালে শিক্ষক অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেন। এ বিয়ের প্রস্তাবক ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে শেখ রেহানার সাথে ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকীর বিয়ে সম্পন্ন হয়। স্থান ছিল লন্ডনের কিলবার্নে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সুখ দুঃখের সাথী, বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মোমিনুল হক খোকার বাড়ি। ভারতে অবস্থানরত শেখ রেহানার বিয়েতে শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও  টাকার অভাবে  বিমানের টিকিট কাটতে পারেননি । এ প্রসঙ্গে শফিক সিদ্দিক লিখেছেন, “৮৩ সালে তখন হাসিনা আপা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে ঢাকায় অবস্থান করছেন। ঐ সময়ে আমি আমার পিএইচডি থিসিসের কাজে ঢাকা গিয়েছিলাম। একদিন হাসিনা আপার বাসায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলাম, উনি হাশেম ভুইয়াঁ নামের একজন কর্মীর অসুস্থ মেয়েকে লন্ডন পাঠাবার ব্যবস্থা করছেন। তখন হাসিনা আপা বেশ দুঃখ করে আমাকে বললেন, ‘শফিক দেখ, আজকে আল্লাহ্'র ইচ্ছায় আমি আমার একজন কর্মীর অসুস্থ মেয়েকে বিদেশ পাঠাতে সাহায্য করতে পারছি। কিন্তু সেদিন আমার একমাত্র বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দিল্লী থেকে লন্ডন যেতে পারিনি, কেবল টিকেটের টাকার অভাবে।’’ এর চেয়ে বড় কষ্ট ও দুঃখের ঘটনা বাংলাদেশের জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যার  জীবনে আর কী হতে পারে?

শেখ রেহানার ভাগ্য এতটাই খারাপ ছিল তাঁর বিয়েতে আপন ভাইবোন বাবা মা কেউ উপস্থিত ছিল না। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ তনায়  জননেত্রী শেখ হাসিনার বিয়েতে পিতা উপস্থিত না থাকতে পারলেও অন্তত পরিবারে মা ভাই বোনেরা উপস্থিত ছিলেন। ভাইদের বিয়েতে পিতা মুজিব উপস্থিত থেকে আশীর্বাদ করেছেন। শেখ রেহানার বেলায় একমাত্র জীবিত বোনও উপস্থিত থাকতে পারেননি। বোধ করি নিষ্ঠুর ভাগ্যের নির্মমতা যেন আরো বেড়ে যায়, যখন শেখ রেহানার মনে হয়, দুলাভাই  পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়াকে অন্তঃত শেখ মুজিবুর রহমান দেখে যেতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু তার দৌহিত্র জয় ও পুতুলকে আদর করতে পেরেছেন। শেখ রেহানার সন্তানেরা তাও পারেনি। দুঃখই যেন শেখ রেহানার জীবন গাথাঁ। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবচেয়ে দুঃখী সন্তানের নাম হলো ‘রেহানা’।

স্বজনহারা ২০ বছরের কিশোরী শেখ রেহানার পাশে এসে পরম বন্ধুর মত দাঁড়ালেন স্বামী অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকী। নিত্য অভাবের সংসার চলে একটি সাবলেটের রুমে। দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে একদিকে লন্ডনে টিকে থাকার লড়াই করছেন অন্যদিকে বোন শেখ হাসিনার সাথে স্বজন হারা ব্যথা নিয়ে দেশে ফিরার জন্য আত্ম সংগ্রাম করছেন।

শেখ রেহানার লন্ডনের জীবন সুখের ছিল না। ছিল প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার নিরন্ত্রর কঠিন সংগ্রাম। মনের সাথে যুদ্ধ। শেখ রেহানা মনে পিতা মাতা হারানোর যন্ত্রণা।বিয়ের পর শফিক সিদ্দিক ও শেখ রেহানাকে নানামুখি সংকট মোকাবেলা করে অগ্রসর হতে হয়েছ। সে সময় আর্থিক কষ্টটাই ছিল প্রবল। বিয়ের পরপরই স্বামীর সাথে চলে আসেন সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে। মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেন আরেক বাঙালি পরিবারের সাথে রুম ভাগাভাগি করে। আর্থিক অনটনের কারণে চাইলেই একক বাড়ি ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। তাই শেখ রেহানাও বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করছিলেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনেও কর্মখালি দেখে চেষ্টা করেছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। নববিবাহিতা স্ত্রীর চাকরি করার বিষয়টি মন থেকে না চাইলেও শফিক সিদ্দিক রাজী হয়েছিলেন দুটি কারণে। (এক) শেখ রেহানা প্রায়ই একা বাসায় থাকতেন এবং সার্বক্ষণিক মা, বাবা, ভাইদের ছবি সামনে নিয়ে কান্নাকাটি করতেন। ফলে শফিক সিদ্দিকের সন্দেহ জেগেছিল, এভাবে একা থাকতে থাকতে শেখ রেহানার মানসিক সমস্যা যদি দেখা দেয়। সুতরাং কাজে থাকলে মানুষের সান্নিধ্যে ও ব্যস্ত থাকার কারণে পনেরোই আগস্টের ভয়াবহ স্মৃতি কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারবেন। (দ্বিতীয়ত) কিছুটা হলেও আর্থিক সমস্যার সমাধান হবে, এই বিবেচনায় তিনি স্ত্রীর চাকরির ব্যাপারে সম্মত হন। কিন্তু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের কাজের ধরণ ব্যাখ্যা করে স্ত্রীর অভিব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন এভাবে, ‘‘তুমি কি জান চাকরিটাতে তোমাকে ছাত্রদের খাবার পরিবেশন করতে হবে এবং সাথে ধোয়া-মোছার কাজও করতে হবে? এই চাকরি কি তুমি করবে?”

উত্তরে শেখ রেহানা বলেছিলেন, “কেন করব না? এরকম কাজতো এদেশে সবাই করে।” একজন রাষ্ট্রপতির মেয়ে হয়েও কাজটি করতে কুন্ঠাবোধ না করায় শফিক সিদ্দিক অত্যন্ত অবাক ও খুশি হয়েছিলেন।

যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা তাও পারিবারিক ঐতিহ্যগত শিক্ষা, যা মা ও বাবার নিকট থেকে পেয়েছেন শেখ রেহানা। শেখ রেহানার জীবন আলেখ্য যেন তার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসার ছায়াপাত। এরপরের জীবন সাউদাম্পটন থেকে লন্ডনে প্রত্যাবর্তন।

লন্ডনে এসে স্বামীসহ শেখ রেহানা আবারও উঠেন মোমিনুল হক খোকার বাড়িতে। ইতোমধ্যে তিনি ও শফিক সিদ্দিক অনেক চেষ্টা তদবির করে চাকরি জোটাতে সক্ষম হন। ভাড়া নেন একটি ছোট্ট বাসা। কেননা বেঁচে থাকা ও জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে প্রথমেই যে দুটি জিনিসের প্রয়োজন তাহলো বাসস্থান ও জীবিকা নির্বাহের জন্য অর্থের জোগান। শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর পালা, ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিসরে। ভাড়া বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে উঠে আসেন তাঁরা। শফিক সিদ্দিক চাকরি করার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার কাজটিও চালিয়ে যেতে থাকেন। শেখ রেহানা চাকরি নেন একটি লাইব্রেরীতে। এখনও চাকরি করেন। লন্ডনেই জন্ম হয় ছেলে রেজোয়ান মুজিব সিদ্দিক ও বড়মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের। ছোট মেয়ের রূপন্তীর জন্ম ব্রুনাইতে। উল্লেখ্য, ব্রুনাইতে কমর্রত অবস্থায়ই ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে শফিক সিদ্দিক পঙ্গুত্ববরণ করে দীর্ঘ কয়েক বছর কর্মজীবন থেকে দূরে ছিলেন।

জীবনযুদ্ধে কিছুটা স্থিত হয়েই শেখ রেহানা শুরু করেন রাজনৈতিক যুদ্ধের প্রস্তুতি। বড় বোন শেখ হাসিনার প্রতিনিধি হয়ে যোগদান করেন সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে অনুষ্ঠিত সর্ব ইউরোপীয় বাকশালের সম্মেলনে ১৯৭৯ সালের ১০ই মে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে শেখ হাসিনার নামে ব্যানার টাঙিয়ে উত্থাপন করেন পনেরোই আগস্ট নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি। এটি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি।যা উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্টকহোম থেকে ফিরে স্বামী শফিক সিদ্দিককে সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন সর্ব ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদ।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন এবং ১৭ মে ৬ বছর নির্বাসন শেষে শেখ রেহানা দেশে ফিরেন। শুরু হয় দুবোনের সংগ্রামের জীবন। প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তবুও পরম ঈশ্বর এসে তাদের বাংলার মানুষের সেবা করার জন্য বাঁচিয়ে রেখেছেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করেন। নির্মোহী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসার মতই শেখ রেহানা ক্ষমতার পোষাক কখনো গায়ে জড়ান নি। বোন প্রধানমন্ত্রী হাবারও রাজনীতি থেকে দুরে থেকে মানুষের কল্যাণের জন্য দুর থেকে বোনকে সহযোগীতা করেছেন। তিনি চাইলেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণে পদে আসীন হতে পারতেন। অথচ ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে জিয়া পরিবারের প্রতিটি সদস্য দেশের সম্পদ লুটপাট করেছে। তাদের হাতে বাদ যায় এতিমদের সম্পদও। এদিকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা রাষ্ট্রের মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজ নামের সম্পদ দান করেছেন।

শেখ রেহানা জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সংগ্রাম ও কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তবুও কখনও সততাকে বিসর্জন দেননি, নীতির প্রশ্নে আপস করেননি তিনি। নিজের একমাত্র বড় বোন দেশের প্রধানমন্ত্রী অথচ শেখ রেহানা লন্ডনে অন্যের অফিসে কাজ করেছেন। গণপরিবহনে যাতায়াত করতেন। অথচ তিনি চাইলেই অনেক বিত্ত বৈভবের মালিক হতে পারতেন, সেটা তিনি কখনও হতে চান নি। সততার এমন মহৎ দৃষ্টান্ত শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের পক্ষেই সম্ভব। শেখ রেহানা একজন প্রচার বিমুখ, নির্মোহ চরিত্রের মানুষে। বাইরে থেকে তাঁর সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানতে পারে না। জননেত্রী শেখ হাসিনার কথা থেকেই মাঝে মাঝে মানুষ তার সম্পর্কে জানতে পারেন। শেখ রেহানাও হৃদয় মানবতায় পূর্ণ। শেখ হাসিনার পাশে বসেই তিনি নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়ে দেশের মানবিক সংবাদগুলো প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। রোহিঙ্গারা স্রোতের মত বাংলাদেশে আসতে লাগলো তখন তিনি বলেছিলেন তাঁর বড় আপাকে, যদি ১৮ কোটি জনগণকে তুমি খাওয়াতে পার তাহলে ১১ লক্ষ লোককেও খাওয়াতে পারবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি বক্তব্যে বলেছিলেন, রেহানা আমাকে একথা বলার পর আমার সিন্ধান্ত নিতে একটুও দেরি হয়নি। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। তিনিই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রধান পরামর্শদাতা। সকল দুর্যোগ দুঃসময়ে ছায়ার মত তিনি তাঁর বড় আপার পাশে আকঁড়ে থাকেন।

করোনাকালে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অসহায় অস্বচ্ছল মানুষদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করছেন তখন ছোট বোন শেখ রেহানা সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল গ্রামের ৪৬১ জন প্রতিবন্ধীর থাকা ও তাদের সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বড় বোনের দৃষ্টিগোচর করেন। তখনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর্থিক অনুদানসহ তাদের জীবনযাত্রা উন্নয়নে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী আরেকটি বক্তব্যে বলেছেন যে, রেহানা তাঁকে স্মরণ করে দিয়েছে যারা রিক্সায় ডিজাইন করে সেসব লোকদের কেও যেন সাহায্যের আওতায় আনা হয়। একজন ব্যক্তির কতটা দেশপ্রেম, দেশের জনগণের প্রতি ভালবাসা থাকলে এতদূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা হয়েও তিনি কখনও সক্রিয় রাজনীতিতে আসেননি। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে নেপথ্যে থেকে সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আওয়ামী লীগের কোন নেতা নন, নেই কোন রাষ্ট্রীয় পদে। তবে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে, ক্রান্তিকালে আশা ভরসার স্থল হয়ে উঠেন। প্রতিটি কাউন্সিলের আগে একটি কথা আসে শেখ রেহানা এবার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসবেন। কিন্তু প্রতিবারই নেতাকর্মীদের আশা ভঙ্গ হয়। বরাবরই তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখান না। অন্তরালেই থেকে যান।

১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গমাতার ভূমিকায় গণঅভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি বাংলার ইতিহাসকে পরিবর্তন করেছিল ঠিক তেমনি ১/১১ সরকারের সময় বড় বোন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্ত ও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে শেখ রেহানা বলেছিলেন,‘এই দিনে আমরা সকলে মিলে অঙ্গীকার করি- আমাদের যা কিছু আছে,তাই দিয়ে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাব। সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গড়ব। সোনার বাংলাকে ভালবাসব। পরশ্রীকাতরতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখব।’

শেখ রেহানা বাঙালি নারীদের আদর্শ। কিভাবে জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া যায়, ক্ষমতার লোভ থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়, কোন পদে না থেকেও দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করা যায়, সেট তার মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন । বর্তমানে তিনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এই নির্মোহ চরিত্রই বাংলাদেশের ইতিহাসে উদাহরণ হয়ে থাকবে। সেই,প্রচারবিমুখ মহীয়সী নারীর শুভ জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক পরিচিতি: প্রশাসনিক কর্মকর্তা, উপাচার্যের কার্যালয়
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় 
সাবেক সভাপতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসক্লাব।

Comments

  • Latest
  • Popular

আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি শুরু

ঈদের ছুটি শেষে ঢাকামুখী মানুষের ঢল

বন্যায় ভাসছে সিলেট-সুনামগঞ্জ

কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজের ঝাঁজে নাভিশ্বাস

ফ্রেন্ডশিপ পর্বত জয় করলেন বাংলাদেশের জাফর সাদেক

ছাগলকাণ্ডে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

গাজায় নিহত বেড়ে ৩৭৪৩১, আহত ৮৫৬৫৩

প্রধানমন্ত্রী আজ দিল্লি যাচ্ছেন 

আজ কবি নির্মলেন্দু গুণের জন্মদিন 

বাংলাদেশকে অল্পতেই আটকে দিয়েছে অজিরা

১০
বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস: মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পরিমাপের গুরুত্ব অপরিসীম
আজ সোমবার বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস ২০২৪। ১৮৭৫ সালের ২০ মে ফ্রান্সের প্যারিসে পরিমাপ সম্পর্কিত ‘মিটার
ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক নয় প্রয়োজন জনসচেতনতা 
বাংলাদেশে দিন দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। গরমের সঙ্গে ডেঙ্গির ছোবল বাড়তে শুরু করে। আর
বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস: / দেশে অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ প্রয়োজন সতর্কতা 
  শুক্রবার ছিল বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস ২০২৪। উচ্চরক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন আর দীর্ঘদিন বাঁচুন। ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন
আন্তর্জাতিক নার্স বা সেবিকা দিবস : / নার্সদের দক্ষ করতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি
আজ রবিবার আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস ২০২৪।  মানব সেবায় অনন্য দায়িত্বপালনকারী নার্সদের স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শনের
Error!: SQLSTATE[42S22]: Column not found: 1054 Unknown column 'parent_cat_type' in 'field list'